ফলের উপকারিতা

চিরতার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং চিরতা খাওয়ার নিয়ম।

ভেষজ উদ্ভিদ ও নানান রোগের মহৌষধ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে চিরতা। এটির সাথে কমবেশি আমরা প্রায় সবাই সুপরিচিত। এর গুণ সম্পর্কে বললে যেন শেষ হবে না। আজকে চিরতার উপকারিতা সম্পর্কে জানবো।

আমরা সকলে প্রায় বাজার থেকে চিরতা কিনে এনে খেয়ে থাকি। কিন্তু সেটি কি আসলেই চিরতা? 

মাথায় রাখতে হবে আসল যে চিরতা আমরা খুঁজি সেটি অনেক বড় কোনো পর্বতে হয়ে থাকে।

ভারত উপমহাদেশের হিমালয়ের আসে পাশে মূলত এই চিরতা পাওয়া গিয়ে থাকে। এখান থেকে মূলত আমাদের দেশে আমরা চিরতা পেয়ে থাকি। শুরুতে ভারতে এটিকে নানান রোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে আমরা বাঙালিরা ও চিরতা ব্যবহার কম বেশি শিখেছি।

তবে একটা বিষয় প্রথমেই জানিয়ে রাখি। চিরতা খাওয়ার যেমন অনেক উপকারিতা আছে। ঠিক তেমন এর কিছু সাইড এফেক্ট বা অপকারিতা আছে। এই অপকারিতা তখন হবে যখন মাত্রার অধিক বা ভুল পরিমাণে আপনি চিরতা খেয়ে থাকবেন।

তো আজকের পুরো আর্টিকেল জুড়ে আমরা মূলত আলোচনা করবো চিরতা নিয়ে। চিরতা খাবার সঠিক নিয়ম ও চিরতার উপকারিতা আজকে আমরা জেনে নিবো। এর পাশাপাশি এটির কি কোনো ক্ষতিকর দিক আছে কিনা সেটি নিয়েও বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করবো। চলুন তাহলে বেশি কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক।

চিরতা কি?

চিরতা হচ্ছে এক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ। এটির ইংরেজি নাম হচ্ছে ‘Clearing nut tree’ এবং বৈজ্ঞানিক ভাবে এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘Swertia chirata Hum’

ভারতের হিমালয়ের উষ্ণ মন্ডলীয় অঞ্চলে এই গাছটি পাওয়া যায়। পাহাড়ি ও উচু এলাকাতে সাধারণত বেশি জন্মে এই গাছগুলো। বাংলাদেশে অনেক জায়গাতে কৃত্রিম ভাবে চিরতা চাষ করা হয়।

কিন্তু আসলে যে চিরতা আমরা খুঁজি সেটি আসে ভারত থেকে। এই গাছটি অনেক রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে থাকে। নানাবিধ উপকারী সমৃদ্ধ উদ্ভিদ বলা যায় এটিকে।

চিরতার উপকারিতা

আমাদের দেহে চিরতার উপকারিতা ও গুনাগুন।

১. জ্বর প্রতিরোধ করে।

ঋতু পরিবর্তনের কারণে কিংবা অন্যান্য কোন কারণে দেখা যায় আমাদের মধ্যে অনেকের ঘন ঘন জ্বর হয়ে থাকে। আর এধরনের জ্বর গুলো দেখা যায় ওষুধ খাওয়ার পরও কমে না। অতিরিক্ত জ্বর এর সাথে আমাদের দেখা দেয় হাত-পা ব্যাথা করার মত সমস্যা। চিরতার পানি খেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

২. এলার্জির সমস্যায় চিরতার উপকারিতা।

যাদের এলার্জির মত বড় সমস্যা আছে তাদের জন্য  চিরতা অনেক কাজে দিতে পারে। এলার্জির সমস্যায় ভুগে থাকলে কয়েকদিন চিরতা খেয়ে দেখতে পারেন। এলার্জি সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন।

তবে এলার্জি হলে খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। এলার্জি সমস্যায় হাসের মাংস, হাসের ডিম, পুই শাক, চিংড়ি মাছ, ইলিশ মাছ, বেগুন খাওয়া যাবে না, এতে এলার্জি সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

৩. লিভারের সমস্যায় চিরতা

আমাদের শরীরের লিভারের সমস্যায় চিরতা উপকার করে থাকে। যদি লিভার নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে, তাহলে চিরতার পানি খেলে সেই সমস্যা উপসম হয়।

৪. বমি বমি ভাব দূর করে।

পিত্তজ্বরে অনেক সময় আমাদের মুখে বমি বমি ভাব থাকে। তাছাড়াও জ্বর হলে কিংবা অন্য কোনো কারণে আমাদের বমি ভাবের সমস্যা বেশি ভোগান্তিতে ফেলে থাকে।

খাদ্য সঠিক ভাবে না খাওয়ার কারণে এই সমস্যা হতে পারে। এধরনের সমস্যা হলে চিরতা খেয়ে দেখতে পারেন। আপনার বমি ঠিক হয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ বাদামের উপকারিতা : জেনে নিন প্রতিদিন বাদাম খেলে কি উপকার পাওয়া যায়

৫. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

চিরতার মধ্যে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দিয়ে থাকে। নিয়মিত নিয়ম করে চিরতা সেবন করলে আমাদের শরীরে হৃদরোগ ও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা অনেকটা কমে যায়।

৬. রক্তশূন্যতায় উপকার হয়।

আপনারা যারা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। তারা চিরতা সেবন করলে অনেকটা উপকার পাবেন। এছাড়াও মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হওয়া, কোথাও কেটে গেলে রক্ত ক্ষরণ হওয়া, নাক দিয়ে রক্ত যাওয়া সমস্যা গুলো থেকে মুক্তি দিতে পারে চিরতা।

তবে যদি রক্তশূন্যতায় কিংবা এই ধরনের সমস্যায় ভুগছেন, তবে আপনার দৈনিক রুটিনে চিরতা কে রাখুন।

৭. ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

এই উদ্ভিদ এর তেতো স্বাদ আমাদের ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। যার ফলে আমাদের সহজে কোনো ধরনের রোগ ব্যাধি হয় না। 

তবে সরাসরি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা নানান রোগ থেকে চিরতা আমাদের বাঁচায় এমনটা নয়।

চিরতা খাওয়ার ফলে আমাদের শরীর এমন ভানে প্রস্তুত হয়। যার ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা বৃদ্ধি পায়। ফলে সহজে কোনো ভাইরাস সংক্রমণ আমাদের হয় না।

৮. কৃমির উপদ্রব কমাতে সাহায্য করে

পেটের মধ্যে কৃমি হলে সেটা সত্যি অনেক বড় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। চিরতার পানি কৃমির উপদ্রব কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও চিরতার পানি পান করার অনেক উপকারিতা রয়েছে।

৯. পাকস্থলীর সমস্যা দূর করে।

পাকস্থলীতে অনেক ধরনের সমস্যায় পড়ে থাকি আমরা। চিরতার তিতা স্বাদ আমাদের বদহজম, গ্যাস, আলছার এর সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।

পাকস্থলীর সুস্থ্যতা রক্ষার্থে চিরতা কে আপন করে নিন আজ থেকেই। এটি আমাদের হজম শক্তিকে বৃদ্ধি করে ও পাকস্থলীর সুস্থ্যতাকে দারুন ভাবে বজায় রাখে।

১০. ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

চিরতা আমাদের শরীরে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক সহায়তা করে থাকে। এটি আমাদের রক্তে সুগার এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। 

যদিও এটা খেতে অনেক তিতা, তাও এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অনেক উপকারী।

১১. চর্মরোগের সমস্যা সমাধান করে।

যাদের চর্মরোগের সমস্যা আছে, তাদের জন্য চিরতা অনেক ভালো উপকারী। এমনিতে চর্মরোগের জন্য আরো নানান উপাদান রয়েছে, তবে এক্ষেত্রে চিরতা চর্মরোগের জন্য বেশি উপকারী বলা যায়।

১২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

এটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। 

১৩. কিডনি ভালো রাখে।

আমাদের শরীরের কিডনি কে সুস্থ্য রাখতে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।

১৪. হাপানি চিকিৎসায় চিরতা

আমাদের আশেপাশে অনেকের হাপানি সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। আর হাপানি চিকিৎসায় চিরতা বেশ উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। আপনার পরিবারে কিংবা আশেপাশে যদি কেউ হাপানি রোগে ভুগে তাহলে তাকে সঠিক মাত্রায় চিরতা খাওয়ান।

১৫. মাথার চুল পড়া প্রতিরোধ করে।

আমাদের মাথার চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যাটি অনেক বড় একটি সমস্যা। প্রতিদিন ৪০-১০০ টি চুল ঝরে যাওয়া স্বাভাবিক বলা যায়। কিন্তু এর থেকে বেশি চুল আমাদের মাথা থেকে ঝরে গেলে এটিকে নিয়ে ভাবতে হবে।

এই চুল পড়ে যাওয়া সমস্যায় আমরা কত কিছুই না ব্যবহার করি। কিছুতে কিছু না হয়ে থাকলে একটি শেষ চেষ্টা হিসেবে চিরতা ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

চিরতার উপকারিতা

এক্ষেত্রে আগের দিন রাতে ৪-৫ গ্রাম চিরতা ভিজিয়ে রাখবেন গরম পানিতে। পরের দিন পানিগুলো ছেকে নিয়ে, পানিগুলো দিয়ে মাথা ভালোমতো ধুয়ে ফেলুন। চুল পড়া সমস্যা থেকে পেয়ে যাবেন মুক্তি।

চিরতা কি পরিমাণে খাবেন?

চিরতার উপকারিতা জানলাম এতক্ষন এখন চিরতার অপকারিতা সম্পর্কে জানবো। এই উদ্ভিদ যেমন একদিক থেকে আমাদের অনেক রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে থাকে। তেমনি খুব বেশি পরিমাণে যদি এটিকে খাওয়া হয় তাহলে এর জন্য বাত এর সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এছাড়া কোমরের সমস্যা, কোমরে ব্যাথা ছাড়াও নানান সমস্যা হয়। তাই আমাদের এটি খাওয়ার মাত্রা ঠিক রাখতে হবে।

দিনে সর্বোচ্চ ২ গ্রাম থেকে ৭ গ্রাম এর মধ্যে চিরতা খাওয়ার মাত্রা রাখতে হবে। এর থেকে বেশি মাত্রায় অবশ্যই খাওয়া যাবে না। ২-৭ গ্রাম এটি হচ্ছে বয়স্কদের চিরতা খাওয়ার মাত্রা। যারা বয়স তেমন বেশি নয় তারা চেষ্টা করুন ২-৫ গ্রামের মধ্যে এটি খাওয়ার মাত্রাকে রাখতে। তাহলে আপনার জন্য এটি বেশ ভালো হয়।

আরও পড়ুনঃ রসুনের উপকারিতা ও ঔষধি গুনাগুনের বিস্তারিত বর্ণনা

আমাদের শেষ কথা

বন্ধুরা আজকে আমরা চিরতার উপকারিতা সম্পর্কে জানলাম। উপরের বলা সমস্যাগুলো যদি আপনার মধ্যে হয়, তাহলে চিরতার সাহায্যে আপনার সেই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি মেলতে পারে।

তবে আমরা জানি যে অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমাদের শরীরের জন্য ভালো নয়। উল্টো এটি আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ঠিক তেমনই চিরতা খুব বেশি মাত্রায় খেলে আপনার নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আর্টিকেলটা ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিতে ভুলবেন না। চিরতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থেকে থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। আল্লাহ হাফেজ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button